কুহুডাক শেকড়কুহুডাক শেকড়কুহুডাক শেকড়
  • হোম
  • শেকড় কমিউনিটি
পড়ছেন: ঢেঁকি
ফন্ট রিসাইজআ
Kuhudak Shekor Kuhudak Shekor
ফন্ট রিসাইজআ
কমিউনিটি
  • হোম
  • শেকড় কমিউনিটি

ঢেঁকি

সংস্কৃতি ও জীবনধারা
শেয়ার
8 মিনিটে পড়ুন
ঢেঁকি - কুহুডাক শেকড়
শেয়ার

ঢেঁকি (Dheki) ছিল বাংলার গ্রামীণ নারীজীবনের কেন্দ্রবিন্দু। রাইস মিল আসার আগে প্রতিটি পরিবারের চাল উৎপাদনের একমাত্র উপায় ছিল এই কাঠের যন্ত্র। শুধু চাল নয়, চালের গুঁড়া, চিড়া, খই, পিঠার আটা সবকিছুর জন্য দরকার হত ঢেঁকি।

পরিচ্ছেদসমূহ
  • সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
  • ইতিহাস ও উৎপত্তি
  • গঠন
  • ব্যবহার
  • নারী ও ঢেঁকি
    • জীবিকার উপায়
  • ঢেঁকিছাঁটা চালের পুষ্টিগুণ
  • সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতিতে ঢেঁকি
  • ঢেঁকির বিদায়
  • বর্তমান অবস্থা
  • ঢেঁকি নিয়ে সচরাচর জিজ্ঞাসা
    • “ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে” – প্রবাদটার মানে কী?
    • ঢেঁকিছাঁটা চাল কি সত্যিই বেশি পুষ্টিকর?
    • ঢেঁকি বানাতে কোন কাঠ সবচেয়ে ভালো?
    • ঢেঁকিতে একবারে কতটা ধান ভানা যেত?

ভোরবেলা ঘুম ভাঙার আগেই শুরু হয়ে যেত শব্দটা। “ঢেঁকুর… ঢেঁকুর… ঢেঁকুর” — একটানা, ছন্দমতো। সেই শব্দ মানে মা বা ভাবি উঠে পড়েছেন। মানে আজ বাড়িতে পিঠা হবে, বা নতুন চাল ভাঙা হচ্ছে। মানে আরেকটা সকাল শুরু হয়েছে বাংলার গ্রামে।

আরও: গরুর গাড়ি

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

বাংলা নামঢেঁকি
ইংরেজি নামFoot-powered, Rice Husker
অন্য নামধেনকি, ঢেঁকুর
উপাদানকাঠ (বেল, তেঁতুল), লোহা
দৈর্ঘ্য৬–৭ হাত (প্রায় ১.৮ মি.)
চালিকাশক্তিমানুষের পায়ের চাপ
ব্যবহারকালপ্রাচীনকাল – ১৯৮০ দশক
মূল ব্যবহারধান ভানা, চালের গুঁড়া
বর্তমান অবস্থাপ্রায় বিলুপ্ত

ইতিহাস ও উৎপত্তি

ঢেঁকির ইতিহাস মানব সভ্যতার সাথে সমান পুরনো। যে মুহূর্ত থেকে মানুষ ধান চাষ শিখেছে, সেই মুহূর্ত থেকেই ধানের তুষ ছাড়ানোর প্রয়োজন হয়েছে। লিভার নীতিতে (Lever principle) কাজ করা এই যন্ত্রটি প্রাচীন ভারতবর্ষ, বাংলা, নেপাল, অসম এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে হাজার বছর ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে “ঢেঁকি”, নেপালে “ঢিকি”, অসমে “ঢেঁকী”, হিন্দিতে “ঢেঁকি” নামগুলো প্রায় একই। এটা বলে দেয় এই যন্ত্র কত গভীরভাবে এই অঞ্চলের কৃষিসভ্যতার অংশ হয়ে গিয়েছিল।

ষাট-সত্তরের দশকে বাংলাদেশের গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে ঢেঁকি ছিল। কোনো কোনো সমৃদ্ধ বাড়িতে একাধিক ঢেঁকি থাকত। ঢেঁকি শুধু নিজের বাড়ির কাজে নয়, প্রতিবেশীদের ধান ভেনে দিয়ে উপার্জনও করা হত।

আরও: পালকি

গঠন

ঢেঁকির গঠন দেখতে সাধারণ হলেও এটা পদার্থবিজ্ঞানের লিভার তত্ত্বের একটা চমৎকার প্রয়োগ। বেল বা তেঁতুল গাছের শক্ত কাঠ দিয়ে তৈরি প্রায় ৬–৭ হাত (১.৮ মিটার) লম্বা একটি মোটা দণ্ড হলো ঢেঁকির মূল কাঠামো। এর সামনের সরু অংশে থাকে মোনাই বা চুরনি, একটি লম্বা কাঠের টুকরা, যার মাথায় বসানো থাকে লোহার গোলাকার পাত যাকে বলে “গুলো”। নিচে মাটি খুঁড়ে তৈরি গোলাকার গর্তের নাম “নোট”।

ব্যবহারের পদ্ধতি সহজ। এক বা দুইজন মহিলা ঢেঁকির পেছনের প্রশস্ত অংশে পা রাখেন। পায়ের চাপে সেই দিকটা নেমে যায়, ফলে সামনের মোনাই উঠে আসে, তারপর ছেড়ে দিলে নিজের ভারে মোনাই নেমে পড়ে নোটের মধ্যে থাকা ধানের উপর। এই উঠা-নামার বারবার পুনরাবৃত্তিতে ধানের তুষ আলগা হয়ে চাল বের হয়ে আসে।

ব্যবহার

ব্যবহারপণ্যমৌসুম / উপলক্ষ
ধান ভানাচাল (ঢেঁকিছাঁটা)সারাবছর, বিশেষত অগ্রহায়ণ
চালের গুঁড়াপিঠার আটাশীতকাল, পিঠাপুলির মৌসুম
চিড়া তৈরিচিড়াসারাবছর, উৎসবে
মশলা গুঁড়াহলুদ, মরিচ গুঁড়াসারাবছর
পান্তার চালঢেঁকিছাঁটা আউশ চালবোরো-আউশ মৌসুমে

নারী ও ঢেঁকি

“ধান ভানি রে, ঢেঁকিতে পার দিয়া। / ঢেঁকি নাচে আমি নাচি, হেলিয়া দুলিয়া।” — গ্রামবাংলার প্রচলিত ঢেঁকিগান

ঢেঁকি চালানো ছিল প্রায় সম্পূর্ণ নারীর কাজ। সকাল ভোরে উঠে ঢেঁকিতে ধান ভানা ছিল গৃহিণীর দৈনন্দিন রুটিনের অংশ। একা একা নয়, দুইজন মিলে ঢেঁকি চালালে কাজ দ্রুত হত এবং পরিশ্রমও ভাগ হয়ে যেত। একজন পায়ে চাপ দেন, আরেকজন হাত দিয়ে ধান নাড়াচাড়া করেন নোটের মধ্যে।

ঢেঁকিতে কাজ করতে করতে নারীরা গান গাইতেন। এই ঢেঁকিগান হয়ে উঠেছিল বাংলার লোকসংগীতের একটি আলাদা ধারা। নবান্নের মৌসুমে, বিয়ের আগের রাতে, ঈদ-পূজার আগে, ঢেঁকিতে গান আর হাসি-গল্পে মুখর হত গ্রামের মহিলামহল।

আরও: হারিকেন (বাতি)

জীবিকার উপায়

গ্রামের দরিদ্র মহিলারা ঢেঁকি দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ধনী গৃহস্তের বাড়িতে গিয়ে ধান ভেনে পারিশ্রমিক হিসেবে চাল নিয়ে আসতেন। এই ব্যবস্থাটা ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির একটা ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ঢেঁকিছাঁটা চালের পুষ্টিগুণ

ঢেঁকিছাঁটা চাল আধুনিক মিলে ছাঁটা চালের চেয়ে অনেক বেশি পুষ্টিকর। কারণ ঢেঁকিতে তুষ ছাড়ানোর সময় বাইরের বাদামি আবরণ (ব্র্যান লেয়ার) অনেকটাই থেকে যায়। এই ব্র্যান লেয়ারেই থাকে বেশিরভাগ ভিটামিন ও খনিজ।

আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান এখন বলছে, ব্রাউন রাইস বা ঢেঁকিছাঁটা চাল ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে, হৃদরোগ প্রতিরোধে এবং হজমে সহায়ক। যে চালকে “পুরনো আমলের” বলে বাতিল করা হয়েছিল, সেটাই এখন স্বাস্থ্য-সচেতন মানুষের পছন্দের তালিকায় ফিরে আসছে।

সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতিতে ঢেঁকি

ঢেঁকি বাংলা সাহিত্য ও প্রবাদে বারবার এসেছে। “ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে” – এই প্রবাদটা বাংলার সবচেয়ে পরিচিত প্রবাদগুলোর একটি। এর অর্থ: স্বভাব কখনো পাল্টায় না। ঢেঁকি এতটাই পরিচিত ছিল যে সমাজের দর্শন বোঝাতেও তাকে ব্যবহার করা হয়েছে।

কবি-সাহিত্যিকরা ঢেঁকিকে গ্রামীণ জীবনের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। জসীমউদ্দীনের কবিতায়, আব্দুল্লাহ আল-মামুনের নাটকে, বাংলা লোকগানে ঢেঁকির উপস্থিতি বারবার ফিরে এসেছে।

ঢেঁকির বিদায়

বাংলাদেশে ছোট ছোট রাইস মিল ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে মূলত ১৯৭০-এর দশক থেকে। ১৯৮০-র দশকে মিলের সংখ্যা দ্রুত বাড়ে। এর কারণ সহজ, ঢেঁকিতে এক মণ ধান ভানতে যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরিশ্রম লাগত, রাইস মিলে সেটা হয়ে যেত মিনিটে এবং খরচও কম।

রাইস মিলের প্রসারের সাথে সাথে ঢেঁকি হারিয়ে গেল। আশির দশকের মাঝামাঝি নাগাদ বেশিরভাগ গ্রামে ঢেঁকির ব্যবহার প্রায় শেষ হয়ে গেছে। যেটুকু টিকে ছিল সেটা গেল নব্বইয়ের দশকে। এখন গ্রামে রাইস মিল আছে, কিন্তু ঢেঁকি নেই।

বর্তমান অবস্থা

আজকের বাংলাদেশে ঢেঁকি কার্যত বিলুপ্ত। বিদ্যুৎহীন অতি প্রত্যন্ত কিছু গ্রামে হয়তো বছরে একদুবার ঢেঁকি বের হয়, পিঠার মৌসুমে। কিন্তু সেটা ব্যতিক্রম। মানিকগঞ্জ, গাইবান্ধা বা ময়মনসিংহের গ্রামীণ কৃষি কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, তাদের এলাকায় ঢেঁকি আর শোনা যায় না।

তবে একটা আশার কথা আছে। ঢেঁকিছাঁটা চাল এখন অনলাইনে বিক্রি হচ্ছে, স্বাস্থ্যকর খাবার হিসেবে। কিছু উদ্যোক্তা ঢেঁকি পুনরুজ্জীবিত করে প্রিমিয়াম ব্রাউন রাইস তৈরি করছেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি জাদুঘরে ঢেঁকি সংরক্ষিত আছে প্রদর্শনীর জন্য।

ঢেঁকি নিয়ে সচরাচর জিজ্ঞাসা

“ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে” – প্রবাদটার মানে কী?

এই প্রবাদটা বোঝায় যে মানুষের স্বভাব বা অভ্যাস পরিবেশ পাল্টালেও পাল্টায় না। ঢেঁকি যেমন যেখানেই থাকুক শুধু ধান ভানার কাজই করে, তেমনি কোনো মানুষ বা জাতির মূল স্বভাব সহজে পরিবর্তন হয় না। ঢেঁকি এতটাই পরিচিত ছিল যে দার্শনিক সত্য বোঝাতেও তাকে উপমা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

ঢেঁকিছাঁটা চাল কি সত্যিই বেশি পুষ্টিকর?

হ্যাঁ, পুষ্টিবিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন। ঢেঁকিতে ধান ভানলে চালের বাইরের বাদামি আবরণ (ব্র্যান লেয়ার) অনেকটা থেকে যায়, যেখানে থাকে ফাইবার, ভিটামিন B১, B৩, ম্যাগনেসিয়াম এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। আধুনিক রাইস মিলে উচ্চ গতিতে ঘষে এই স্তর সম্পূর্ণ সরিয়ে ফেলা হয়, ফলে সাদা চাল হয় কিন্তু পুষ্টিগুণ অনেকটাই কমে যায়।

ঢেঁকি বানাতে কোন কাঠ সবচেয়ে ভালো?

বেল গাছ এবং তেঁতুল গাছের কাঠ ঢেঁকি তৈরির জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত বলে মনে করা হত। কারণ এই কাঠ অত্যন্ত শক্ত, ভারী এবং দীর্ঘস্থায়ী। বারবার জোরে আঘাতের চাপ সহ্য করতে পারে। পানিতে ভিজলেও সহজে পচে না। ছুতার মিস্ত্রিরা এই কাঠ কেটে মসৃণ করে ঢেঁকির আকৃতিতে তৈরি করতেন, তারপর লোহার কারিগর মোনাইয়ের মাথায় গুলো লাগিয়ে দিতেন।

ঢেঁকিতে একবারে কতটা ধান ভানা যেত?

একসাথে নোটে প্রায় ৪–৬ কেজি ধান দেওয়া যেত। একজন দক্ষ মহিলা এক ঘণ্টায় প্রায় ৮–১০ কেজি ধান ভানতে পারতেন, দুইজন মিলে আরো বেশি। তবে এটা শারীরিকভাবে পরিশ্রমের কাজ ছিল, তাই সাধারণত সকাল ভোরে বা বিকেলে যখন গরম কম থাকে তখন ঢেঁকি চালানো হত।


ফেসবুক: Kuhudak

শেয়ার করুন
ফেসবুক Whatsapp Whatsapp লিঙ্ক কপি করুন

👍 আপনার জন্য আরও

নকশি কাঁথা - কুহুডাক শেকড়
নকশি কাঁথা
2 মিনিটে পড়ুন
খড়ম - কুহুডাক শেকড়
খড়ম
7 মিনিটে পড়ুন
হাল বা লাঙল - কুহুডাক শেকড়
হাল বা লাঙল
8 মিনিটে পড়ুন
গরুর গাড়ি - কুহুডাক শেকড়
গরুর গাড়ি
8 মিনিটে পড়ুন
গোল্লাছুট - কুহুডাক শেকড়
গোল্লাছুট
6 মিনিটে পড়ুন
অতি লোভে তাঁতি নষ্ট - কুহুডাক শেকড়
অতি লোভে তাঁতি নষ্ট
8 মিনিটে পড়ুন

আপনার জন্য আরও

হারিকেন (বাতি) - কুহুডাক শেকড়
সংস্কৃতি ও জীবনধারা

হারিকেন (বাতি)

9 মিনিটে পড়ুন
কুহুডাক শেকড়
⟩
Kuhudak Mobile App Download

ওয়েবসাইটের কোথাও ভুল বা অসঙ্গতি থাকলে অনুগ্রহ করে আমাকে জানান, যাতে আমি দ্রুত সংশোধন করতে পারি।

Kuhudak Shekor Kuhudak Shekor

শেকড়ে আপনার স্মৃতি রয়েছে!

[email protected]

ভ্রমণের যেকোনো প্রয়োজনে আমাকে ইমেইল করুন।

  • আমার সম্পর্কে
  • যোগাযোগ
  • বিজ্ঞাপন
  • শর্তাবলী
  • গোপনীয়তা
  • সাইটম্যাপ
  • কপিরাইট
Facebook Youtube Instagram Pinterest

© কুহুডাক শেকড়, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত