কুহুডাক শেকড়কুহুডাক শেকড়কুহুডাক শেকড়
  • হোম
  • শেকড় কমিউনিটি
পড়ছেন: পালকি
ফন্ট রিসাইজআ
Kuhudak Shekor Kuhudak Shekor
ফন্ট রিসাইজআ
কমিউনিটি
  • হোম
  • শেকড় কমিউনিটি

পালকি

ইতিহাস ও ঐতিহ্য
1
শেয়ার
8 মিনিটে পড়ুন
পালকি - কুহুডাক শেকড়
শেয়ার

পালকি (Palki) শব্দটা শুনলেই মনে পড়ে জসীমউদ্দীনের সেই বিখ্যাত কবিতার লাইন। কনের কপালে সিঁদুর, চোখে পানি, আর দুলতে দুলতে এগিয়ে যাওয়া কাঠের সেই ছোট্ট ঘরটি। বিয়ের অনুষ্ঠানে পালকি ছিল আবশ্যিক আয়োজন, আর বেহারাদের মুখে থাকত সুরেলা হেঁইয়ো ডাক।

পরিচ্ছেদসমূহ
  • সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
  • ইতিহাস ও উৎপত্তি
  • গঠন ও প্রকারভেদ
  • বেহারা
  • বিবাহ অনুষ্ঠান ও সামাজিক জীবনে পালকি
    • জমিদার ও অভিজাত শ্রেণির বাহন
    • ধর্মীয় ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায়
  • পালকির পতন
  • বর্তমান অবস্থা ও সংরক্ষণ
  • পালকি নিয়ে সচরাচর জিজ্ঞাসা
    • “বেহারা” কারা এবং তারা কি এখনো আছেন?
    • পালকিতে চড়তে কেমন অনুভূতি হত?
    • পালকি কি শুধু ধনীরা ব্যবহার করত?
    • সাহিত্যে পালকির উল্লেখ কোথায় কোথায় আছে?
    • বর্তমানে কোথাও কি পালকি দেখা যায়?

চাকা আবিষ্কার হওয়ার পরও মানুষ কিন্তু পালকি ছাড়েনি। কারণ গ্রামবাংলার কাদামাখা আলপথ, নদীপার, ধানক্ষেতের আইল, এসব জায়গায় চাকাওয়ালা যান যেখানে ঢুকতেই পারত না, সেখানে পালকি বেহারাদের কাঁধে চড়ে অনায়াসে পৌঁছে যেত। এটাই ছিল পালকির অপ্রতিদ্বন্দ্বী সুবিধা।

আরও: গরুর গাড়ি

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

বাংলা নামপালকি
সংস্কৃত উৎসপালঙ্ক (শয্যা)
ইংরেজি নামPalanquin / Palankeen
প্রথম উল্লেখরামায়ণ, খ্রি.পূ. ২৫০
বাহকবেহারা / কাহার
বেহারার সংখ্যা২ থেকে ৮ জন
ব্যবহারকালপ্রাচীনকাল – ১৯৫০ দশক
বর্তমান অবস্থাপ্রায় বিলুপ্ত
উপাদানকাঠ, বাঁশ, কাপড়, লোহা

ইতিহাস ও উৎপত্তি

পালকি শব্দটি এসেছে সংস্কৃত “পালঙ্ক” থেকে, যার অর্থ শয্যা বা বিছানা। পালি ভাষায় এটা হয় “পালাঙ্ক”, আর সেখান থেকেই হিন্দি ও বাংলায় “পালকি”। পর্তুগিজরা এই শব্দটাকে তাদের মতো করে “পালানকুইন” বানিয়ে ইউরোপে ছড়িয়ে দেয়।

রামায়ণে খ্রিস্টপূর্ব ২৫০ সালের দিকে পালকির উল্লেখ পাওয়া যায়। তার আগেও আহত সৈন্য বা অসুস্থ মানুষকে বহনের জন্য “ডোল” নামের একটি খোলা কাঠামো ব্যবহার হত। পালকি মূলত সেই ডোলেরই পরিশীলিত রূপ। মহাভারত, বৃহদ্ধর্ম পুরাণ সহ একাধিক প্রাচীন গ্রন্থে পালকি বাহকদের উল্লেখ আছে।

মোগল আমলে পালকি রাজকীয় মর্যাদার প্রতীক হয়ে ওঠে। আকবরের আমলে সেনা চলাচলেও পালকি ব্যবহৃত হত। মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা ১৩৫০ সালের দিকে নিজে পালকিতে চড়েছিলেন এবং তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্তে তা লিপিবদ্ধ আছে। ব্রিটিশ আমলে ইউরোপীয় কর্মকর্তারাও পালকি ব্যবহার করতেন, বিশেষত কলকাতায়।

আরও: হারিকেন (বাতি)

গঠন ও প্রকারভেদ

পালকি মূলত একটি কাঠের বা বাঁশের তৈরি আয়তাকার কাঠামো, যার চারদিকে পর্দা বা দরজা থাকে এবং দুই প্রান্ত থেকে দুটি বা ৪টি লম্বা বাঁশের খুঁটি বেরিয়ে থাকে। সেই খুঁটি ধরে বেহারারা কাঁধে তুলে বহন করেন। ভেতরে থাকার জায়গায় বালিশ, গদি এবং ঝালর লাগানো পর্দা দিয়ে সজ্জিত করা হত। অভিজাত পালকিতে থাকত নকশাকাটা কাঠের কারুকাজ, রেশমি কাপড়ের আস্তরণ এবং কখনো কখনো রুপার কাজও।

ধরনবৈশিষ্ট্যবেহারার সংখ্যাব্যবহারকারী
ডুলিসবচেয়ে ছোট, সাদামাটা নকশা২ জনসাধারণ মানুষ
সাধারণ পালকিমাঝারি আকার, কাপড়ের পর্দা৪ জনমধ্যবিত্ত পরিবার
মিয়ানা পালকিবড়, নকশাকাটা কাঠ৪–৬ জনসম্ভ্রান্ত পরিবার
রাজকীয় পালকিসোনা-রুপার কাজ, রেশমি আস্তরণ৮ জনজমিদার, নবাব
চাঁদোয়া পালকিউপরে ছাউনি সহ উন্মুক্ত৪–৬ জনসামরিক কর্মকর্তা

বেহারা

“হেঁইও জোয়ান, সরু আল, চলো ধরে। কর্তাবাবুর, দরাজ দিল, দেবে ধরে।” — পুরনো বেহারাদের গান

পালকির গল্পে বেহারাদের কথা না বললে অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বেহারা বা কাহার ছিলেন সেই মানুষ, যারা পালকি কাঁধে নিয়ে মাঠ-ঘাট পাড়ি দিতেন। বাংলাদেশে এক সময় হাড়ি, মাল, দুলে, বাগদি বা উড়ি সম্প্রদায়ের মানুষ এই পেশায় ছিলেন। পালকি বহনের পাশাপাশি তারা দিনমজুরির কাজ বা মাছের ব্যবসাও করতেন।

বেহারাদের একটা বিশেষ গুণ ছিল, হাঁটার সময় তাল মিলিয়ে গান গাওয়া। সেই সুরের দোলায় পালকিও দুলত ছন্দে ছন্দে। ক্লান্তি কমাতে আর পথ ছোট করতে তারা গেয়ে চলতেন “হেঁইও” ডাকে। দীর্ঘ পথে বেহারারা ভাগ করে বিশ্রাম নিতেন। একদল থামলে আরেকদল কাঁধ দিত, পালকি মাটিতে নামত না।

বেহারাদের সামাজিক অবস্থান ছিল নিচু, কিন্তু তাদের পেশাদারিত্ব ও দক্ষতা ছিল অতুলনীয়। ভালো বেহারার দল পেতে হলে অগ্রিম বুকিং দিতে হত।

বিবাহ অনুষ্ঠান ও সামাজিক জীবনে পালকি

বাংলাদেশে পালকির সবচেয়ে বড় ব্যবহার ছিল বিয়েতে। কনেকে শ্বশুরবাড়ি পাঠানো হত পালকিতে চড়িয়ে, এটা ছিল প্রথা, সম্মানের বিষয়। পালকি না থাকলে বিয়েটাই যেন অসম্পূর্ণ মনে হত। গায়ে হলুদ থেকে শুরু করে বিদায়বেলা পর্যন্ত পালকি ঘিরে থাকত নানা অনুষ্ঠান।

জমিদার ও অভিজাত শ্রেণির বাহন

জমিদারি আমলে পালকি ছিল ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির প্রতীক। জমিদার সাহেব প্রজাদের জমি দেখতে বের হলে রাজকীয় পালকিতে, বেহারারা সামনে পিছনে, এক-আধজন ছাতা ধরে হাঁটত। প্রজারা দূর থেকেই বুঝতে পারত কর্তা আসছেন।

ধর্মীয় ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায়

শুধু আনন্দ নয়, মৃত্যুর শোকেও পালকি ছিল। অসুস্থ মানুষকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া থেকে মৃত ব্যক্তির শেষযাত্রায়, পালকির উপস্থিতি ছিল বাংলার সামাজিক জীবনের প্রতিটি মোড়ে।

পালকির পতন

পালকির আনুমানিক ব্যবহার (আপেক্ষিক সূচক) আধুনিক যানবাহনের প্রসার (আপেক্ষিক সূচক)। দশক অনুযায়ী পালকির পতন ও আধুনিক যানবাহনের উত্থান (আনুমানিক, আপেক্ষিক সূচক ০–১০০):

পালকি - কুহুডাক শেকড়

পালকির পতনের শুরু হয় ১৯৩০-এর দশকে, যখন ঢাকায় রিকশার প্রচলন শুরু হয়। চাকাওয়ালা রিকশা ছিল দ্রুততর, সস্তা এবং একজন মানুষেই চালানো যেত। ধীরে ধীরে গ্রামে গ্রামে রাস্তা পাকা হতে লাগল, মোটর গাড়ি আসল, তারপর টেম্পো-ভ্যান। প্রতিটি নতুন যানবাহন পালকির চাহিদা আরেকটু কমিয়ে দিল।

১৯৫০-এর দশকের পরে পালকি শুধু দুর্গম এলাকায় টিকে ছিল, যেখানে রাস্তা নেই, যানবাহন নেই। ১৯৭০-৮০ দশকের মধ্যে সেই জায়গাগুলোতেও রাস্তা পৌঁছে গেল। আর সাথে সাথে পালকিও বিদায় নিল।

বর্তমান অবস্থা ও সংরক্ষণ

আজকের বাংলাদেশে পালকি কার্যত বিলুপ্ত। তবে কুষ্টিয়া জেলায় পালকিবাহক ভাস্কর্য দাঁড়িয়ে আছে স্মৃতির স্তম্ভ হিসেবে। ঢাকার শীতকালীন মেলায়, পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রায় মাঝে মাঝে পালকি প্রদর্শিত হয়। কিন্তু সেটা ইতিহাসের টুকরো হিসেবে, ব্যবহারিক বাহন হিসেবে নয়।

বরিশালের গৌরনদীতে সম্প্রতি পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রায় পালকি ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসকের বক্তব্য: “আজকের প্রজন্মের অনেকেই জানে না পালকি কী। তারা কেবল বইয়ের পাতায় দেখে।” এই উপলব্ধি থেকেই শেকড়-এর মতো উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা যায়।

জাদুঘরেও পালকি সংরক্ষিত আছে কোথাও কোথাও। পুরনো জমিদারবাড়িতে মাঝে মাঝে ভাঙাচোরা পালকির কাঠামো দেখা যায়। ধুলো জমা, রঙ উঠে গেছে, কিন্তু কাঠের শরীরে এখনো সেই কারিগরির ছাপ আছে।

পালকি নিয়ে সচরাচর জিজ্ঞাসা

“বেহারা” কারা এবং তারা কি এখনো আছেন?

বেহারা বা কাহার হলো সেই পেশাজীবী শ্রেণি যারা পালকি বহনের কাজ করতেন। বাংলাদেশে হাড়ি, মাল, দুলে, বাগদি বা উড়ি সম্প্রদায়ের মানুষ এই কাজ করতেন। পালকি বিলুপ্ত হওয়ার সাথে সাথে এই পেশাও শেষ হয়ে গেছে। তবে এই সম্প্রদায়গুলো এখনো আছেন। তারা এখন দিনমজুর, কৃষি কাজ বা মাছ ধরার পেশায় আছেন।

পালকিতে চড়তে কেমন অনুভূতি হত?

পালকিতে চড়া ছিল একটু দোদুল্যমান অভিজ্ঞতা, বেহারারা হাঁটার তালে পালকি সামনে-পিছনে দুলত। দ্রুত গতিতে গেলে দুলুনি বেশি হত। পুরনো মানুষদের কাছে শোনা যায়, পালকির ভেতরে বসে বাইরের দৃশ্য দেখার একটা আলাদা আনন্দ ছিল, পর্দার ফাঁক দিয়ে গ্রামের পথ দেখতে দেখতে চলা।

পালকি কি শুধু ধনীরা ব্যবহার করত?

না, সব শ্রেণির মানুষ পালকি ব্যবহার করতেন, তবে ধরন আলাদা ছিল। গরিব মানুষ ছোট ডুলি ভাড়া নিতেন বিশেষ দরকারে, মধ্যবিত্তরা বিয়েতে সাধারণ পালকি আনতেন, আর ধনী পরিবার ও জমিদাররা নিজেদের সাজানো রাজকীয় পালকি রাখতেন। ভাড়ার পালকিও পাওয়া যেত, অনেকটা আজকের ট্যাক্সির মতো।

সাহিত্যে পালকির উল্লেখ কোথায় কোথায় আছে?

বাংলা সাহিত্যে পালকির উপস্থিতি বহু জায়গায়। জসীমউদ্দীনের “নকশীকাঁথার মাঠ”-এ পালকির বর্ণনা আছে, রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে পালকি এসেছে বারবার। বাংলাদেশের লোকসংগীতেও “পালকির গান” আলাদা একটা ঘরানা ছিল। যেখানে বেহারাদের কণ্ঠস্বর, পথের বর্ণনা আর বিচ্ছেদের বেদনা একসাথে মিশে থাকত।

বর্তমানে কোথাও কি পালকি দেখা যায়?

হ্যাঁ, কিছু জায়গায় দেখা যায়, তবে ব্যবহারের জন্য নয়। জাতীয় জাদুঘর, কিছু স্থানীয় যাদুঘর এবং পুরনো জমিদারবাড়িতে পালকি সংরক্ষিত আছে। পহেলা বৈশাখ বা লোক উৎসবে প্রতীকীভাবে পালকি বের হয়। এছাড়া কুষ্টিয়ায় পালকিবাহক ভাস্কর্য আছে। বিয়ের অনুষ্ঠানে পালকি ভাড়া পাওয়া এখন কার্যত অসম্ভব।


ফেসবুক: Kuhudak

শেয়ার করুন
ফেসবুক Whatsapp Whatsapp লিঙ্ক কপি করুন

👍 আপনার জন্য আরও

গোল্লাছুট - কুহুডাক শেকড়
গোল্লাছুট
6 মিনিটে পড়ুন
কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ - কুহুডাক শেকড়
কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ
7 মিনিটে পড়ুন
জব্বারের বলীখেলা - কুহুডাক শেকড়
জব্বারের বলীখেলা
5 মিনিটে পড়ুন
লাটিম - কুহুডাক শেকড়
লাটিম
7 মিনিটে পড়ুন
ঢেঁকি - কুহুডাক শেকড়
ঢেঁকি
8 মিনিটে পড়ুন
কাবাডি - কুহুডাক শেকড়
কাবাডি
7 মিনিটে পড়ুন

আপনার জন্য আরও

বায়োস্কোপ - কুহুডাক শেকড়
ইতিহাস ও ঐতিহ্য

বায়োস্কোপ

7 মিনিটে পড়ুন
কুহুডাক শেকড়
⟩
Kuhudak Mobile App Download

ওয়েবসাইটের কোথাও ভুল বা অসঙ্গতি থাকলে অনুগ্রহ করে আমাকে জানান, যাতে আমি দ্রুত সংশোধন করতে পারি।

Kuhudak Shekor Kuhudak Shekor

শেকড়ে আপনার স্মৃতি রয়েছে!

[email protected]

ভ্রমণের যেকোনো প্রয়োজনে আমাকে ইমেইল করুন।

  • আমার সম্পর্কে
  • যোগাযোগ
  • বিজ্ঞাপন
  • শর্তাবলী
  • গোপনীয়তা
  • সাইটম্যাপ
  • কপিরাইট
Facebook Youtube Instagram Pinterest

© কুহুডাক শেকড়, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত